Obiroto - খবর চলতেই থাকে
Obiroto

খবর চলতেই থাকে

Home দেশ রাজ্য বিদেশ বিনোদন খেলাধুলা শরীর স্বাস্থ্য টেক ফিচার গল্প
ভাদর মাসে ভাদু পূজা'— রাঢ় বাংলার এই প্রাচীন উৎসব ও তার বিলুপ্তির গল্প জানেন?
16 May, 2026 1 মিনিট

ভাদর মাসে ভাদু পূজা'— রাঢ় বাংলার এই প্রাচীন উৎসব ও তার বিলুপ্তির গল্প জানেন?

ভাদ্রমাস এলেই মনে পরে রাঢ় বাংলার ইতিহাস এর কথা, মনে হয় বাতাসে যেন একটা বিশেষ গন্ধ মেশেপুরুলিয়া| বহুকাল আগে এই সময়ে বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমানের গ্রামের উঠোনে সন্ধ্যা নামলেই মেয়েরা একসাথে জড়ো হয়ে গাইতেন "ভাদু গান" | ভাদু গানের বিশেষত্ব হল, এখানে টুসু বা ঝুমুর গানের মতন প্রেম বা রাজনৈতিক কথা বর্জন করে তুলে ধরা হয়ে গ্রাম বাংলার সাধারণ কথা | 

পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার সীমানায় সারেঙ্গা গ্রামে ভাদু পুজোয় মহিলারা

তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, কে এই ভাদু? লোকশ্রুতি বলে, ১৮৪১  পঞ্চকোট রাজবংশের রাজা নীলমণি সিংহদেওয়ের পালিত কন্যা ভদ্রাবতীর (ভাদু) অকালপ্রয়াণ কে উৎসর্গ করে শোকার্ত গ্রামবাসীদের পুজোর গান | আবার লোককথায় ভাদু বলতে শস্যদেবী মা লক্ষ্মীর  অবতারও বোঝায় |  ভাদু গান কোনো পারফরমেন্স নয়, এটি  রাঢ় বাংলার স্মৃতি, নারীদের কণ্ঠে সংরক্ষিত এক জীবন্ত দলিল | 

ভাদু গানের বিষয়বস্তু শুধু ভাদুর করুন প্রেমকাহিনী, বা শোক যাপনের বৃহত্তে সীমিত নয় | এই গান একাধারে গ্রামের সকল নারীদের শস্যবন্দনা, শোকগাথা- তাদের অন্তরের কথা | চার লাইনের এই ছড়ায় বাঁধা, না আছে কোনো লিখিত  স্বরলিপি, না কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, অথচ, হাস্যরস থেকে সমাজ সমালোচনাসব কিছুর কি সুন্দর সমীকরণ| এই নিষ্পাপ সারল্যের জন্য, এই গান না কোনো বিশেষ জাতি বা সম্প্রদায়ের, এই গান শুধুমাত্র রাঢ়ের সমস্ত নারীর | 

 

রাঢ় বাংলার এক উঠোনে প্রদীপের আলোয় ভাদু গানে মগ্ন গ্রামীণ মহিলারা

পঞ্চকোট ইতিহাস গবেষক শ্রী দিলীপ গোস্বামী তার লেখায় জানিয়েছেন যে ভাদু কোনো প্রকারেই উপবাস করার উৎসব নয় | এই উৎসব উল্লাস ও উচ্ছাসের , তাই ভাদুকে ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন মিষ্টি তৈরির প্রথাগঠিত ইতিহাস | তারই মধ্যে প্রধান মিষ্টি হলো জিলিপি | সুতরং ভাদুর মিষ্টির সেই জৌলুস না থাকলেও ঐতিহ্য কিন্তু একই রকম রয়ে গেছে | 

আশ্চর্যের বিষয় হল, এই ভাদু উৎসব ঐতিহ্যগতভাবে প্রান্তিক ও রূপান্তরকামী মানুষদেরও এক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করেছে, কিন্তু বর্তমানে এই গান বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় | আধুনিক সময়ে টেলিভিশন এসে ভেঙে দিয়েছে উঠোনের আসর| স্মার্টফোন  গ্রাস করেছে সন্ধ্যের সেই সম্মিলিত গান গাওয়ার অভ্যেস | শহরের মঞ্চে যখন ভাদু গান মাঝে মধ্যে তুলে আনা হয়, তখন সেটা আর শিল্প বলা চলে না- তা শুনে মনে হয় যেন একটি বিপন্ন পাখিকে খাঁচায় পুরে তার প্রদর্শনী চলছে |

তবে আশার আলো সম্পূর্ণ নিভে যায়নি, পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার সীমানায় সারেঙ্গা গ্রামের মতো কিছু অঞ্চলে মেয়েরা আজ ভাদ্রের প্রতিটি সন্ধ্যায় একসাথে জড়ো হন মাটির ভাদুর সামনে | ঢোল আর মাদলের তালে ওঠে গান - পরব শেষে বিসর্জনের কান্নাও মেশা থাকে তাতে | ভদ্র মাস আসে, চলেও যায় , ভাদুর মূর্তিও প্রথাগত ভাবে ভাসানো হয়ে নদীতে | কিন্তু, তিলে তিলে বেড়ে চলা এই আধুনিকতার ভিড়ে যদি এই মাটির গান সত্যিই কোনোদিন হারিয়ে যায়? এযে কেবল মাত্র এক সুর নয়, এটি যে পল্লীবাংলার প্রাণ , যদি এইসব মাটির গান সত্যিই হারিয়ে যায়, তবে হারাবে রাঢ় বাংলার হাজার বছরের আত্মা।

ফেসবুকে শেয়ার করুন টুইটারে শেয়ার করুন

সম্পর্কিত খবর