আমের মরশুমে ফের চর্চায় মালদা
প্রতিবেদন: বিকাশ চন্দ্র বিশ্বাস:- গরম পড়তেই বাজারে বাড়তে শুরু করেছে আমের আনাগোনা। আর আমের মরশুম এলেই স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় উঠে আসে মালদা। বাংলার “আমের জেলা” হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত এই জেলা। শুধু রাজ্য নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এমনকি বিদেশের বাজারেও মালদার আমের আলাদা কদর রয়েছে।
ফজলি, হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, ল্যাংড়া— একের পর এক জনপ্রিয় আমের সম্ভারে এখন ব্যস্ত জেলার আমবাগানগুলি। কোথাও কাঁচা আমে ভরে রয়েছে গাছ, কোথাও আবার পাকতে শুরু করেছে মরশুমের প্রথম দফার ফল। সব মিলিয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন আম ঘিরেই ব্যস্ততা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চাষিদের একাংশের দাবি, এ বছর আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। বিশেষ করে হিমসাগর ও লক্ষ্মণভোগের চাহিদা ইতিমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে। কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন বাজারে মালদার আম পৌঁছতে শুরু করেছে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য রাজ্যেও পাঠানো হচ্ছে আম।
আম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এই সময় জেলার বহু মানুষ কাজের সুযোগ পান। পরিবহণ, প্যাকেজিং, বাছাই, হিমঘর— বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মৌসুমি কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
তবে আশার পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। কৃষকদের বক্তব্য, অতিবৃষ্টি, ঝড় কিংবা অনিয়মিত আবহাওয়ার প্রভাব আম উৎপাদনে পড়তে পারে। অনেকের দাবি, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো গেলে মালদার আম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় জায়গা করে নিতে পারবে।
মালদায় বহু পুরনো আমচাষের ঐতিহ্য রয়েছে। জেলার গঙ্গা-মহানন্দা অববাহিকার উর্বর মাটি আম উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগীবলে মনে করেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে জেলার হাজার হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলায় প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়। এর মধ্যে ফজলি, হিমসাগর (খিরসাপাতি), লক্ষ্মণভোগ, ল্যাংড়া ও আম্রপালি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। ২০২৩ সালে “ফজলি”, “হিমসাগর” ও “লক্ষ্মণভোগ” GI Tag পাওয়ার পর মালদার আম আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নতুন পরিচিতি পেয়েছে। এর ফলে বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও বেড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
গত কয়েক বছরে বাহরিন, দুবাই, বাংলাদেশ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে মালদার আম পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ ও উন্নত সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনও বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত হিমঘর নেই। দালাল নির্ভর বাজার ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় কৃষকরা ন্যায্য দাম পান না বলেও অভিযোগ। এছাড়া আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ম মানতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে আম শুধু একটি ফল নয়, মালদার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আম মরশুমে জেলার অর্থনীতিতে কয়েকশো কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
স্বাদ, গন্ধ ও ঐতিহ্যের টানেই প্রতি বছর গরম পড়লেই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে মালদার আম। বাংলার গর্ব হিসেবে এখনও সেই জনপ্রিয়তা অটুট।